স্বাধীনতা ডেস্ক:
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে গত ২২ সেপ্টেম্বর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (সুপারনিউমারারি) মোহাম্মদ এনামুল হককে খাগড়াছড়ির এপিবিএন ও বিশেষায়িত ট্রেনিং সেন্টারে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে পদায়ন করা হয়। কিন্তু আদেশ জারির এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনো সিলেট ছাড়েননি। পুলিশের অন্দরমহলে এখন এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে— বদলি হওয়ার পরেও কেন যাচ্ছেন না এনাম?
গোপন সূত্রে জানা গেছে, এনামের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বদলি বাণিজ্য, থানা-ফাঁড়ি থেকে মাসোহারা আদায় এবং নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিককালে শাহপরান থানার এসআই সুব্রতকে উপশহর পুলিশ ফাঁড়িতে পদায়নের জন্য এক ব্যবসায়ীর মাধ্যমে ২ লাখ টাকা এনামের কাছে পৌঁছেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একইভাবে বর্তমানে সিটিএসবি-তে কর্মরত লামাবাজার পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক ইনচার্জ এসআই আলী খান (বিকাশ কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত) সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির আইসি হওয়ার জন্য এনামকে ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাদের বদলি হয়নি। পরে টাকা ‘হালাল’ করার উদ্দেশ্যে এসআই সুব্রতকে বন্দরবাজার ফাঁড়ির টুআইসি হিসেবে পদায়ন করা হয়।
জানা য, এনাম বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তির বাসায় নিয়মিত যাতায়াত করেন এবং উপশহরের একটি দোকানে প্রায়ই আড্ডা দেন। থানা ও ফাঁড়ি থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আছে। বদলির আদেশ এলেও তিনি যেন কোনো অদৃশ্য ছত্রছায়ায় রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের আইজিপি, এসএমপি কমিশনারসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকতাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমাগত বিরূপ পোস্টকারী একটি চক্রকে ঢাকা থেকে গ্রেফতার করার পর তাদের গডফাদার হিসেবে আব্দুর রব ভুট্টো নামে এক ব্যক্তির নাম জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে। আব্দুর রব ভুট্টোসহ গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণকালে তাতে ন.গ্ন হস্তক্ষেপ করেন মোহাম্মদ এনামুল হক। তিনি এজাহার সংশোধনে বাদিকে বাধ্য করেন এবং মামলা থেকে আব্দুর রব ভুট্টোর নাম বাদ দেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আওয়ামী দুঃশাসনকালে যেভাবে গোপালগঞ্জের বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে বিভিন্নভাবে কর্মকর্তারা সুবিধা আদায় করতেন, ঠিক একই কৌশলে নিজেকে বগুড়ার নাগরিক দাবি করে এবং এক প্রতিমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচয় দিয়ে পুলিশে দাপট দেখিয়ে যাচ্ছেন এনাম। তিনি প্রতিমন্ত্রীকে কাজে লাগিয়ে নিজের বদলি আটকে দিয়েছেন এবং বর্তমান কমিশনার তারই বন্ধু শামীম সারোয়ার মুর্শেদকে সরিয়ে নিজেই এসএমপি কমিশনার হওয়ার পায়তারা করছেন।
গোপন সংবাদে জানা যায়, এনামুল হক কমিশনার এসএমপি কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি কমিশনারের নাম ভাঙিয়ে এসএমপিতে সর্বক্ষেত্রে কর্তৃত্ব খাটাচ্ছেন বলে অভিযোগ করছেন অনেকে। গত জুলাইয়ে সারোয়ার মুর্শেদ শামীম এসএমপির কমিশনার হিসেবে যোগ দেওয়ার পর থেকে এনাম তার নাম ভাঙ্গিয়ে সর্বক্ষেত্রে প্রভাব আরও বাড়িয়েছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, বদলির আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও এনাম এখনো সিলেটে অবস্থান করছেন। এতে প্রশ্ন উঠেছে—আদেশ উপেক্ষা করার সাহস তিনি কোথায় পেলেন? কমিশনার শামীম কি এ বিষয়ে জানেন? নাকি বন্ধুত্বের টানেই নীরব রয়েছেন?
এদিকে এসএমপির ভেতরেও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেকে বলছেন, কমিশনার শামীম যদি সত্যিই এসব বিষয়ে অবগত থাকেন, তাহলে তার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। আর যদি না জানেন, তাহলে প্রশাসনিক ব্যর্থতা কোথায়?
এনামের বিরুদ্ধে আরও যেসব অভিযোগ শোনা যাচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে- বিভিন্ন থানায় পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে টাকা নেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের লোকদের সুবিধাজনক পোস্টিং দেওয়া এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত ‘চাঁদা’ আদায়। তবে পুলিশের অন্দরমহলে এ নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—এনাম কি সত্যিই কমিশনারের ছত্রছায়ায় রয়েছেন, নাকি তার নিজস্ব প্রভাবই যথেষ্ট? আর বদলির আদেশ উপেক্ষা করে সিলেটে থেকে যাওয়ার এই সাহস কি শুধুই বন্ধুত্বের ফসল? পুলিশ প্রশাসনের ভাবমূর্তি রক্ষায় এখনই স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করছেন অনেকে।
