Skip to content
সিলেট

সুনামগঞ্জে এমপি নুরুলের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও হামলার অভিযোগ

সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল

স্বাধীনতা ডেস্ক

এক কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে এবং এ নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল লোকজন নিয়ে নির্মাণকাজের সাইটে গিয়ে হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন এক ঠিকাদার। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিরখলা-১ সেতু নির্মাণস্থলে গিয়ে সংসদ সদস্য ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ইসলাম ট্রেডার্সের প্রকৌশলী, ম্যানেজার, রোলারচালক ও পে-লোডারচালককে মারধর করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এর আগে একই দিন সংসদ সদস্য ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি, প্রাণনাশের হুমকি, পুলিশি হয়রানি এবং সরকারি উন্নয়নকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেন ইসলাম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে সংসদ সদস্য তার সাইটে হামলা চালান বলে অভিযোগ করেন শফিকুল। নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

ছবি : হামলায় আহত মেসার্স ইসলাম ট্রেডার্সের ম্যানেজারসহ কর্মচারীরা

দৈনিক স্বাধীনতাকে শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস আগে তিনি সেতু নির্মাণের কাজটি পান। কাজ পাওয়ার পর সংসদ সদস্য তাঁকে ডেকে নিয়ে কাজটি তাঁর লোকজনকে দিয়ে দিতে বলেন। কিন্তু কাজ পেতে তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে জানিয়ে শফিকুল এতে রাজি হননি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ সদস্য তাঁকে কাজ করতে দেওয়া হবে না বলে হুমকি দেন।

শফিকুলের ভাষ্য, পরে সেতু ও সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করলে সংসদ সদস্য তাঁকে এক কোটি টাকা চাঁদা দিতে বলেন। চাঁদা না দিলে কাজ করতে পারবেন না বলেও জানানো হয়। তিনি বলেন, “এমপি সাহেব আমাকে বলেছেন, এখানে কাজ করতে হলে এক কোটি টাকা দিতে হবে। আমি এত কষ্ট করে কাজ পেয়েছি, টাকা কীভাবে দিয়ে দেব? চাঁদা দিলে আমি কাজ করব কীভাবে?”

ঠিকাদারের অভিযোগ, সংযোগ সড়কের কাজ শেষ করে মূল সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করার সময় গত ২০ অক্টোবর সংসদ সদস্য দুই দফায় নির্মাণস্থলে যান। সকাল ১১টা ও বিকেল ৫টার দিকে সেখানে গিয়ে তিনি কাজ বন্ধ করে দেন। এ সময় বন বিভাগের কর্মকর্তা এবং ইসলাম ট্রেডার্সের প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপক উপস্থিত ছিলেন। বন বিভাগের অনুমতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে গাছ কাটার কাজ চলছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন শফিকুল।

তিনি অভিযোগ করেন, নির্মাণস্থলে তাঁর প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপককে গালিগালাজ করা হয়। সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা না করা পর্যন্ত কাজ চালানো যাবে না বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ঠিকাদারকে সুনামগঞ্জে নিয়ে গিয়ে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করানোর কথা বলা হয়। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীরা রাত ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সংসদ সদস্যের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে পারেননি বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ছবি : অভিযোগকারী শফিকুল ইসলাম

শফিকুল আরও বলেন, ওই রাতেই সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান নাঈম তাঁকে ফোন করে সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি সমাধানের জন্য চাপ দেন। এ ছাড়া গত ৫ অক্টোবর জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু ফোনে তাঁকে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর মঙ্গলবারের হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি শফিকুলের। তিনি বলেন, “আমি আর কোনো উপায় না পেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিয়েছি। অভিযোগ জমা দেওয়ার রসিদও নিয়ে এসেছি। এই খবর পেয়ে আরও ক্ষিপ্ত হয়ে মঙ্গলবার তিনি আবার দলবল নিয়ে সাইটে যান। সেখানে আমার রোলারচালক, পে-লোডারচালক, প্রকৌশলী ও ব্যবস্থাপককে মারধর করা হয়েছে।”

শফিকুলের দাবি, সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল নিজে এ সময় উপস্থিত ছিলেন। তাঁর সঙ্গে বিএনপির কয়েকজন নেতা-কর্মীও ছিলেন, যাঁদের মধ্যে রাজু, সোহেল ও কালা চান নামে ব্যক্তিরা ছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি। মারধরের শিকার কর্মীদের চিকিৎসার জন্য সিলেটে নিয়ে এসেছেন বলেও জানান এই ঠিকাদার। তাঁর অভিযোগ, মঙ্গলবারও নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁকে পরদিন সংসদ সদস্যের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়েছে।

ঘটনার বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেছেন কি না- জানতে চাইলে শফিকুল বলেন, সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করলে উল্টো হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, এর আগেও চাঁদা না দেওয়ার কারণে তাঁকে রাজনৈতিক মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং তাঁর কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই বলেও দাবি করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেওয়া লিখিত আবেদনে শফিকুল অভিযোগ করেছেন, তাঁর কাছে বিভিন্ন সময়ে মোট এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছে। দাবি পূরণ না করায় তাঁকে চাপ, ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব ঘটনায় তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা গুরুতর হামলা কিংবা প্রাণহানির ঝুঁকিতে রয়েছেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আবেদনে উল্লেখ করা হয়, গত ২১ অক্টোবর সুনামগঞ্জ সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সিলেট নগরের কোতোয়ালি থানাধীন সুবিদবাজারের এক্সেল টাওয়ারে তাঁর বাসায় অভিযান চালায়। এ সময় এসআই মো. জহির হোসেন, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. জাকারিয়া আহমেদসহ ১০ থেকে ১৫ জন পুলিশ সদস্য এবং অন্য কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁকে আটকের উদ্দেশ্যে বাসায় তল্লাশি চালানো হয় এবং তাঁর স্ত্রীকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

শফিকুলের অভিযোগ, ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম হাজীপাড়া এলাকায় সার্কিট হাউসের সামনের সড়কে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিলের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় তাঁকে আসামি করা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সদর থানায় করা ওই মামলার নম্বর ৩৪। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিভিন্ন ধারায় করা মামলায় তাঁকে ৫১ নম্বর আসামি করা হয় বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন তিনি।

তবে মিছিলের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না দাবি করে শফিকুল অভিযোগ করেন, সংসদ সদস্যের নির্দেশে জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে মামলায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করিয়েছেন। তাঁর দাবি, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর তাঁকে হয়রানির উদ্দেশ্যে এ মামলায় জড়ানো হয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ২৮ মার্চ জামালগঞ্জ থানার বেহেলী ইউনিয়নের করালজান বিল এলাকায় মাছ চুরির অভিযোগে করা আরেকটি মামলায়ও তাঁকে আসামি করা হয়েছিল বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৯ মার্চ দায়ের করা ওই মামলার নম্বর ২০। এতে তাঁকে ১৩ নম্বর আসামি করা হলেও পরে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দেওয়া আবেদনে শফিকুল ইসলাম নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তাঁর ব্যবসা ও ঠিকাদারি কাজ নির্বিঘ্নে পরিচালনার পরিবেশ তৈরির অনুরোধ জানিয়েছেন। আবেদনের সঙ্গে সুনামগঞ্জ সদর থানার মামলা নম্বর ৩৪ ও জামালগঞ্জ থানার মামলা নম্বর ২০-এর এজাহারের অনুলিপি, বাসায় অভিযানের সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফোনকলের রেকর্ড ও অডিও সংযুক্ত করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুলের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে চাঁদা দাবি, নির্মাণকাজে বাধা ও মঙ্গলবারের হামলার অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট অন্য যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাঁদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়েরকৃত অভিযোগের পিডিএফ-

শেয়ার করুন